বিদায়ী বছরকে বৈশ্বিক পণ্যবাজারের জন্য বৈপরীত্যপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে মূল্যবান ও শিল্পধাতুর দামে ছিল শক্তিশালী উত্থান, অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও কৃষিপণ্যের বড় অংশে দেখা গেছে নিম্নমুখী ধারা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর প্রত্যাশা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত পণ্যবাজারে দামের এ ভিন্নমুখী প্রবণতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত ২০২৫ সালের বৈশ্বিক পণ্যবাজারের এ প্রবণতা অনেকটাই বহাল থাকবে ২০২৬ সালেও। খবর রয়টার্স ও বিবিসি।
মূল্যবান ধাতু
মূল্যবান ধাতুর মধ্যে স্বর্ণ ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে ২০২৫ সালে। বছরটিতে স্বর্ণের দাম প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে এবং সর্বোচ্চ আউন্সপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় সুদহার কমার প্রত্যাশা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং নিরাপদ বিনিয়োগে ঝোঁক স্বর্ণের চাহিদা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয় ধাতুটির দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
রুপার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ চাহিদার পাশাপাশি শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের ব্যবহার ২০২৫ সালে দরবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বছরটিতে রুপার দাম প্রায় ১৬১ শতাংশ বেড়ে একপর্যায়ে পৌঁছায় আউন্সপ্রতি প্রায় ৮৩ ডলার ৬২ সেন্টে। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তালিকায় রুপার অন্তর্ভুক্তি এবং সীমিত সরবরাহ ধাতুটির দাম বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামেও গত বছরে উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে। প্লাটিনামের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪৬ শতাংশ। বছরের শেষ সপ্তাহে ধাতুটির দাম আউন্সপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৪৭৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে প্যালাডিয়ামের দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। ইউরোপে গাড়ির নির্গমন নীতিতে পরিবর্তন, গাড়ির ধোঁয়া পরিশোধন যন্ত্রে (অটো ক্যাটালিস্ট) এসব ধাতুর ব্যবহার অব্যাহত থাকা এবং সরবরাহ সংকট প্লাটিনামের বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতিগুলোয় ২০২৬ সালে নীতিগত সুদহার কমার প্রত্যাশায় মূল্যবান ধাতুর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বজায় থাকতে পারে। তবে উচ্চ দামের কারণে বাজারে অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
শিল্পধাতু
শিল্পধাতুর বাজারে ২০২৫ সালে অধিকাংশ ধাতুর দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তামার দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) খাতে চাহিদা বাড়ায় গত বছরে তামার দাম প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে খনি দুর্ঘটনা ও সরবরাহ ব্যাঘাত ধাতুটির বাজারে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ায় সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় দাম বেড়েছে টিনেরও। অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে চীন সরকার ধাতু গলানোর কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার ওপর সীমা আরোপ করায় অতিরিক্ত সরবরাহ বাড়েনি। এতে জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তিতে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দামের নিম্নমুখী ধারা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
আকরিক লোহার দামে কিছুটা সহায়ক ছিল চীনের আবাসন খাতকে চাঙ্গা করতে নেয়া নীতির প্রভাবে ধাতুটির চাহিদা। তবে ইস্পাত উৎপাদন কম থাকায় কয়লার বাজার ২০২৫ সালে তুলনামূলক দুর্বল ছিল। সামগ্রিকভাবে শিল্পধাতুর দামে উত্থান থাকলেও পণ্যভেদে মাত্রা ছিল ভিন্ন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালে শিল্পধাতুর চাহিদা ব্যাপক মাত্রায় হ্রাসের খুব একটা সম্ভাবনা নেই। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে দামের ঊর্ধ্বমুখী ধারা শ্লথ হতে পারে। এক্ষেত্রে চীনের নীতিগত অবস্থানই শিল্পধাতুর বাজারে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখা দেবে।
জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেলের বাজারে ২০২৫ সালে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বছরটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ও মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। ওপেক প্লাসের উৎপাদন নীতি, বাজারে বাড়তি সরবরাহ এবং চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল থাকা জ্বালানি পণ্যটির দামে চাপ তৈরি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও এসব প্রভাবের কারণে জ্বালানি তেলের দামে উত্থান ঘটেনি।
২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের দামের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ওপেক প্লাসের উৎপাদন সিদ্ধান্তই হবে প্রধান নিয়ামক। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকলে দামে বড় উত্থানের সম্ভাবনা সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কৃষিপণ্য
কৃষিপণ্যের বাজারে ২০২৫ সালে ছিল স্পষ্ট নিম্নমুখী ধারা। আগের বছরের বড় উল্লম্ফনের পর কোকোর দাম গত বছরে প্রায় ৪৮ শতাংশ কমে যায়। চিনি ও কফির দামও অতিরিক্ত সরবরাহ ও চাহিদা শ্লথতার কারণে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমেছে।
সয়াবিনের বাজারে বছরের শেষ দিকে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কে উন্নতির ফলে শুল্কজনিত চাপ কমায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি আবার শুরু করে বেইজিং। তবে বছরের শুরুতে হওয়া পণ্যটির দরপতনের ধারা পুরোপুরি কাটেনি।
গমের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মজুদ বেশি থাকায় দাম ছিল নিম্নমুখী। পাম অয়েল ও রাবারের দামও ২০২৫ সালে কমেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন ভালো থাকায় সরবরাহ বেড়েছে রাবারের। আর গাড়ি শিল্পে দুর্বল চাহিদার কারণে দাম কমেছে পণ্যটির।
বিশ্লেষকরা বলেন, ২০২৬ সালে কৃষিপণ্যের বাজারে আবহাওয়া বড় ঝুঁকি হিসেবে থাকবে। সরবরাহ বেশি থাকলে দাম ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব বজায় থাকবে।